![]() |
প্যারা শুমচা |
প্যারা শুমচা বা ম্যানগ্রোভ পিট্টা নামক ছোট পাখিটি বিভিন্ন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য অরণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাণী। এই উপমহাদেশের বাসিন্দা হিসেবে পাখিটির প্রায় সকল তথ্যই চমকপ্রদ।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য:
প্যারা শুমচা পাখিটির আকৃতি ছোট এবং রঙিন। এর দেহের উপরের অংশ সবুজ এবং পেটের অংশ নীল-সাদা রঙের হয়ে থাকে। ডানার রঙও বিভিন্ন ধরনের হয়—নীল, সবুজ, বাদামী ইত্যাদি। এই পাখিটির লেজ খাটো এবং মাথায় একটি কালো স্ট্রাইপ দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখিটির ওজন প্রায় ৪০-৫০ গ্রাম এবং লম্বায় ১৮-২১ সেন্টিমিটার হয়। উজ্জ্বল রঙের কারণে এই পাখিটি সহজেই চোখে পড়ে এবং তা এটির শিকার ধরার একাগ্রতাকে সাহায্য করে।
বাসস্থান ও পরিবেশ:
প্যারা শুমচা পাখিটি প্রধানত ম্যানগ্রোভ তথা প্যারার জঙ্গলে বসবাস করে। এছাড়া এটি অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চল এবং নোনা পানি উপকূলবর্তী অরণ্যেও দেখা যায়। পানির কাছাকাছি এলাকায় এই পাখিটি বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় জলবায়ুতে এটি বেশী সমৃদ্ধ হয়। এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যে অধিক পাওয়া যায়।
খাদ্যাভ্যাস:
এই ধরনের পাখির খাদ্যাভ্যাস খুবই বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন ছোট কীটপতঙ্গ, যেমন মাথা ঝাঁকিয়ে, পোকা, গুবরে পোকা এবং কেঁচো খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। কখনও কখনও ছোট ব্যাঙ এবং ক্ষুদ্র সরীসৃপও এর খাদ্যতালিকায় স্থান পায়। প্যারা শুমচা শিকার করতে দ্রুত গতিতে ডানা ঝাঁকিয়ে মাটি থেকে তার খাদ্য সংগ্রহ করে।
প্রজনন:
প্যারা শুমচা পাখিটির প্রজনন প্রক্রিয়া বেশিরভাগ সময় বৃষ্টির মৌসুমে আরম্ভ হয়। এই সময় পুরুষ পাখিটি সঙ্গিনীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গাছের ডালে বা মাটিতে বসে গান গায়। পাখিটির বাসা প্রধানত মাটির কাছাকাছি থাকে। স্ত্রী পাখিটি ডিম পাড়ে এবং সাধারণত ৩-৫টি ডিম পাড়ে। ডিম থেকে ছানা ফোটার সময় বাবা-মা দুজনে মিলে যত্ন নেয়। ছানাগুলো প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে উড়তে সক্ষম হয়।
আচরণ ও সামাজিক জীবন:
প্যারা শুমচা সাধারণত একাকী জীব ধারণ করে। তবে প্রজনন মৌসুমে ইহা জোড়ায় বা ক্ষুদ্র দলে চলাফেরা করতে দেখা যায়। ম্যানগ্রোভের গাছের উচ্চ শাখায় বসলেও খাদ্য সংগ্রহের জন্য মাটির কাছাকাছি নামে। এটি স্বল্প উচ্চতায় উড়ে বেড়ায় এবং কণ্ঠস্বর দিয়ে সঙ্গীদের দিকে সংকেত পাঠায়। পাখিটির গানের ধ্বনি মিষ্টি এবং সরল সুরের হয়।
সংরক্ষণ:
প্রাকৃতিক বাসস্থান হারানোর কারণে প্যারা শুমচা পাখিটি বর্তমানে সংকটাপন্ন। মানগ্রোভ অরণ্যের ধ্বংস, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানুষের আক্রমণের কারণে পাখিটির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। সঠিক সংরক্ষণ নীতি প্রয়োগ করা না হলে এই পাখিটি বিলুপ্তির পথে যেতে পারে। সংরক্ষণের উদ্যোগ যেমন—জঙ্গলের পুনঃঃস্থাপন, অভয়ারণ্য সৃষ্টিসহ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা দরকার।
তথ্যসূত্রঃ
১. বন দপ্তর, বাংলাদেশ সরকার।
২. পাখির জগৎ, লেখক: ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।
Post a Comment